সয়াবিন তেলের কর্পোরেট আগ্রাসনে হারিয়ে গেছে স্বাস্থ্যসম্মত সরিষার তেল
২৫ কোটি মানুষের দেশের খাদ্যের বাজার বিশাল। কৃষিভিত্তিক দেশ হয়েও খাবারের বাজারের নিয়ন্ত্রণ বুঝে বা না বুঝে আস্তে আস্তে তুলে দেয়া হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। তার একটি উদাহারণ হলো সরিষার তেল।
৮০ দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে মুল ভোজ্য তেল ছিল সরিষার তেল। তারপর কম দামে রেশনে দেয়া শুরু হল পাম ওয়েল। কোথায় থেকে যেন সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল, পাম ওয়েল স্বাস্থ্যের জন্য খুব খারাপ। তখনও বাজারে সয়াবিন তেল পাওয়া যেত, কিন্তু খুব একটা বিক্রি হত না। রেশনে এর পর দেয়া শুরু হল সয়াবিন তেল। তারপর যেন কীভাবে সরিষার তেল খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো, রান্না ঘরের শেলফ দখল করলো সয়াবিন তেল। এখন চলছে সয়াবিন তেলের দুর্দান্ত দাপট। জাহাজ ভর্তি করে ক্ষতিকর জিএমও সয়াবিন তেল আমদানী হলো। সরিষার তেল আমাদের খাদ্য তালিকা থেকে উধাও হয়ে গেলো, আর উধাও হল এই শিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষ।
সরিষার তেল এই উধাও হয়ে যাওয়ার সময়ের সাথে আমেরিকার তিনটি গবেষণার যোগসূত্র আছে। গবেষণাগুলো হয়েছিল পর পর ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত। এই গবেষণায় দেখা হয়েছিল ইদুরের উপর সরিষার তেলের অন্যতম উপাদান ইউরেসিক অ্যাসিড (একটি ফ্যাটি অ্যাসিড) এর ক্ষতিকর প্রভাব আছে কিনা? ফলাফল আসলো হ্যাঁ আছে। এই গবেষণার ফলাফলের পর আমেরিকা, কানাডা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সরিষার তেল মানুষের খাবার অনুপযোগী ঘোষণা করে। গবেষকরা অসৎ উদ্দেশ্যে ইঁদুরের উপর সরিষার তেলের প্রভাব নিয়ে গবেষণাগুলো করে। কারণ ইদুর কোন উদ্ভিতজাত তেল হজম করতে পারে না, সেই ভোজ্য তেলে ইউরেসিক অ্যাসিড থাকুক আর না থাকুক। সয়াবিন তেল দিয়ে এই গবেষণা করলেও একই ফলাফল পাওয়া যেত। পরবর্তীতে মানুষের উপর ইউরেসিক অ্যাসিডের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় কোন ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়নি। কিন্তু এখনো আমেরিকায় বিক্রিত সরিষার তেলের গায়ে লেখা থাকে “ফর এক্সটারনাল ইউজ অনলি”। কেন? কারণ ভারত ও বাংলাদেশে সরিষার তেল খাওয়া বিপুল জনগোষ্ঠীর বাজার, পশ্চিমের সয়াবিন বিক্রেতাদের হাত থেকে যেন ছুটে না যায়।
সরিষার তেলে কোন স্বাস্থ্য ঝুকি নেই; এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত। অনেক ক্ষেত্রে সরিষার তেলের পুষ্টিমান অন্য অনেক আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের চাইতে বেশি। হৃদপিণ্ডের জন্য ক্ষতিকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট সয়াবিন তেলে ১৫% আর সরিষার তেলে মাত্র ১২%। হৃদবান্ধব মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট সরিষার তেলে ৬০% আর পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ২১%। আমরা ওমেগা ৩ বা ওমেগা ৬ এর হৃদরোগ প্রতিরোধী ভুমিকার কথা সবার জানা। সরিষার তেলের এই পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ২৫ ভাগ ওমেগা ৩ এবং ৭৫ ভাগ ওমেগা ৬। আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিসনে ২০০৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে যারা ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষার তেল খায় তাদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অন্যদের চাইতে কম। সরিষার তেলে রান্না খাবার খেলে কার্ডিওভাসকুলার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমে যায়।
ঐতিহ্যগতভাবে এই তেল আমাদের পূর্বপুরুষেরা ব্যবহার করে আসছেন। তাই যেকোন খাবার রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ডা. মুহম্মদ মারুফ